Posts

A K SARKER SHAON

মলাটের নিচে বাণিজ্যে বন্দী কবিতা: প্রকাশনা সিন্ডিকেট ও সমকালীন সাহিত্য-সংকট
এ কে সরকার শাওন

১. ভূমিকা:
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস মূলত কবিতাকেন্দ্রীক। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, কিংবা রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ হয়ে আধুনিক কাল; বাঙালীর চিন্তার মানচিত্র গড়ে উঠেছে কবিতার হাত ধরে। কবিতা সাহিত্যের চারটি রূপের মধ্যে আদিমতম রূপ। ছন্দ, তাল ও আবেগের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা হয়। কবিতা মানুষের সুখ, দুঃখ, প্রেম কিংবা বিদ্রোহের অনুভূতিকে খুব কম কথায় সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারে।

২. সাহিত্যের শক্তিশালী ধারা কবিতা:
ইংরেজ রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং পার্সি বিশি শেলি উভয়েই কবিতাকে সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতার শক্তির উৎস হিসেবে মানুষের অভ্যন্তরীণ আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে একে \"শক্তিশালী অনুভূতির এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ\" বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে পি বি শেলি কবিতার শক্তিকে আরও ব্যাপক ও সামাজিক রূপ দিয়ে কবিদের \"এই পৃথিবীর অঘোষিত আইনপ্রণেতা\" বলে ঘোষণা করেছেন; কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা মানুষের কল্পনাশক্তি ও নৈতিক চেতনাকে জাগ্রত করে সমাজ ও চিন্তাজগতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এই বিষয়ে আমি অনেক আগেই \'সাহিত্য ও কবিতার কথা\' শিরোনামে একটি পাঠকপ্রিয় আর্টিকেল লিখেছিলাম।

৩. কবিতার অশনিসংকেত:
সমকালীন বইবাজারে সবচেয়ে অবহেলিত, অপাঙ্ক্তেয় এবং ‘অচল’ পণ্যটির নাম কবিতা। অমর একুশে বইমেলাসহ দেশের প্রধান বইবাজারগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার কবিতার বই প্রকাশিত হলেও সেগুলোর সিংহভাগেরই কোনো পাঠক নেই।

একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে এসে কবিতার বই না চলার পেছনে কেবল ‘পাঠকের অনীহা’ বা ‘ভিডিও মাধ্যমের দাপট’কে দায়ী করে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এর অন্তরালে জড়িয়ে আছে এক শ্রেণির প্রকাশকের অনৈতিক জালিয়াতি, সামাজিক পরিচিতির সংকটে ভোগা একদল পয়সাওয়ালা শৌখিন লেখক, ছদ্ম-লেখক, ভার্চুয়াল চৌর্যবৃত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার চরম অভাব। সমকালীন কবিতাচর্চার এই বহুমাত্রিক অবক্ষয় ও তার ভেতরের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে আমার একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক অনুসন্ধান।

৪. আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এবং ‘শো-পিস’ সংস্কৃতির উত্থান:
বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি দৃশ্যমান, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা কৃত্রিম পরিচিতির সংকট বলে আখ্যয়িত করেন। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত শ্রেণির একাংশ; যাদের অনেককে সামাজিক বাস্তবতায় ‘শো-পিস গৃহবধূ’ বা ড্রয়িংরুমের অভিজাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তারা নিজেদের সমাজে একটু ‘আলাদা’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়ে জাহির করতে কবিতাকে সবচেয়ে সস্তা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন সমাজে অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট থাকা এক শ্রেণির পেশাজীবী। কর্মজীবনের অলস পয়সা কিংবা ক্ষমতার গ্ল্যামারকে সাহিত্যের আঙিনায় স্থায়ী রূপ দিতে এরা রাতারাতি ‘কবি’ খেতাব কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

৫. ইচ্ছেমতো কবিতা ও চুরির সংস্কৃতি:
এই ছদ্ম-কবিদের নিজস্ব কোনো মেধা, পাঠাভ্যাস বা সৃজনশীলতার গভীরতা থাকে না। ফলে জন্ম নেয় ‘ইচ্ছেমতো শব্দ সাজিয়ে কবিতা’ বানানোর এক অদ্ভুত সংস্কৃতি। যখন নিজের মেধা দিয়ে কবিতা আসে না, তখন তারা আশ্রয় নেন চৌর্যবৃত্তির। অন্যের সৃষ্টিকে হুবহু বা কিছুটা পরিবর্তন করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা সাহিত্যের মৌলিকত্বকে বিষাক্ত করে তুলছে।

৬. অর্থলিপ্সু প্রকাশক ও ভাড়ায় খাটা রিভিউ সিন্ডিকেট:
এই মানহীনতার বাজারকে টিকিয়ে রাখছে এবং চাঙ্গা করছে প্রকাশনা খাতের একটি বড় সিন্ডিকেট। বাণিজ্যিক প্রকাশকদের একাংশের কাছে সাহিত্যের মানের চেয়ে লেখকের পকেটের সাইজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে যেকোনো রদ্দি বা মানহীন পাণ্ডুলিপি সুদৃশ্য মলাটে ছেপে দিতে এই প্রকাশকদের বিবেক বিন্দুমাত্র বাধে না।
বই প্রকাশের পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের অনৈতিক বিপণন বাণিজ্য:
পেইড মিডিয়া কভারেজ: প্রভাবশালী ও ছদ্ম-লেখকেরা নিজেদের পকেটের টাকা ঢেলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় বা অনলাইন পোর্টালে রঙিন প্রমোশনাল ফিচার ও বুক-রিভিউ করান।

ভাড়ায় খাটা রিভিউ রাইটার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদল ভাড়ায় খাটা ‘রিভিউয়ার’ বা সাহিত্যিক তোষামোদকারী তৈরি হয়েছে। এরা নির্দিষ্ট অংকের টাকা বা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এই সব জঞ্জাল মার্কা বইকে ‘কালজয়ী সৃষ্টি’ কিংবা ‘বছরের সেরা বই’ বলে প্রচার করে। এর ফলে সাধারণ ও সরল পাঠক বিভ্রান্ত হচ্ছেন। পাঠক যখন বুক-রিভিউ দেখে কৌতূহল নিয়ে সেই কবিতার বই কেনেন, তখন তারা প্রতারিত বোধ করেন। এই ধারাবাহিক প্রতারণার চূড়ান্ত ফল হলো; পাঠক সামগ্রিকভাবে সমকালীন কবিতার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন এবং চিরতরে কবিতার বই কেনা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

৭. অসাধু প্রকাশকের ছলচাতুরী এবং ‘সংখ্যা-প্রতারণা’
একজন সত্যিকারের বা নতুন কবির আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু প্রকাশক চরম ব্যবসায়িক জালিয়াতি চালাচ্ছেন। নতুন বা মাঝারি সারির লেখকদের কাছ থেকে সাধারণত ১০০০ কপি বই ছাপানোর পুরো খরচ অগ্রিম বুঝে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে, ডিজিটাল বা অফসেট প্রিন্টিংয়ের এই যুগে প্রকাশকেরা মাত্র ১০০ বা ২০০ কপি বই প্রিন্ট করে মেলায় বা দোকানে তোলেন।
এই সংখ্যা-প্রতারণার ক্ষতিকর দিকগুলো:
কৃত্রিম সংকট: বইমেলায় দু-চারদিন যাওয়ার পরই বলা হয় ‘বই শেষ’, যা আসলে এক ধরনের কৃত্রিম জনপ্রিয়তার ভাওতাবাজি।
রয়্যালটি চুরি: বইমেলা বা দোকানে প্রকৃতপক্ষে কত কপি বই বিক্রি হলো, তার কোনো সঠিক হিসাব লেখককে দেওয়া হয় না।
ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের অভাব: আধুনিক যুগেও প্রকাশনা খাতে কোনো সেন্ট্রাল বারকোড সিস্টেম বা স্বচ্ছ ডিজিটাল ট্র্যাকিং না থাকায় এই অন্ধকারের জালিয়াতি বছরের পর বছর আড়ালোই থেকে যাচ্ছে।

৮. ভার্চুয়াল চৌর্যবৃত্তি ও আইনি জটিলতা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপ ও পেজগুলো এখন কবিতা চুরির প্রধান অভয়ারণ্য। কোনো তরুণ বা উদীয়মান কবি একটি চমৎকার কবিতা পোস্ট করার পর মুহূর্তেই তা কপি-পেস্ট সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে। আমি নিজেই এর সাক্ষী। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে লেখার মাঝে জগলু লিখেছি। এরপর কথাসাহিত্যের দিকে পা বাড়িয়েছি।

মূল কবির নাম সম্পূর্ণ কেটে দিয়ে, কিংবা নিজের নাম বসিয়ে অন্যের কবিতা গ্রুপে গ্রুপে পোস্ট করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আমাদের দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা কপিরাইট আইন থাকলেও ইন্টারনেটের এই সুবিশাল সমুদ্রে লেখা চুরির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাওয়া একজন সাধারণ কবির পক্ষে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। কোনো শক্ত প্রতিরোধ না থাকায় এই ভার্চুয়াল চোরেরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং প্রকৃত লেখকেরা মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে লেখালেখিই ছেড়ে দিচ্ছেন।

৯. আড়ালে আলোর কবিরা: পৃষ্ঠপোষকতার হাহাকার
এই করপোরেট, ক্ষমতা ও অর্থকেন্দ্রিক সাহিত্য-বাজারের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক বা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল সত্যিকারের প্রতিভাবান কবিরা। যাদের পকেটে প্রকাশকের চাহিদা মেটানোর মতো লাখ টাকা নেই, তাদের মানসম্মত, কালোত্তীর্ণ পাণ্ডুলিপি বছরের পর বছর প্রকাশকদের টেবিলের ড্রয়ারেই কিংবা নীজের তোষকের তলায় অবহেলায় পড়ে থাকে।

কর্পোরেট স্পন্সরশিপ, রাষ্ট্রীয় অনুদান, বড় বড় সাহিত্য পুরস্কার কিংবা গণমাধ্যমের লাইমলাইট; সবই আজ ঘুরপাক খাচ্ছে প্রভাবশালী আমলা, পেশাজীবি বা বিত্তবানদের বৃত্তে। ফলে একজন দরিদ্র কিন্তু খাঁটি কবিকে আলোর বৃত্তে টেনে আনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা জাতীয় উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মেধার চেয়ে টাকার জোর যেখানে বড়, সেখানে কবিতা ডুকরে কাঁদে।

১০. উত্তরণের পথ: মেধার রাজত্ব ফিরিয়ে আনা:
কবিতা কোনো ড্রয়িংরুমের শো-পিস বা সামাজিক মর্যাদার সস্তা অলঙ্কার নয়; এটি একটি জাতির মননশীলতা ও আত্মিক বিকাশের আয়না। এই ভয়াবহ অবক্ষয় থেকে কবিতাকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বের কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
কঠোর গেটকিপিং ও সম্পাদনা পরিষদ: প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে পাণ্ডুলিপি নির্বাচনের জন্য সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ‘সম্পাদনা বোর্ড’ গঠন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
মুদ্রণ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকির মাধ্যমে প্রতিটি বইয়ের প্রিন্ট সংখ্যা (Run size) সুনির্দিষ্ট বারকোডের মাধ্যমে ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করা, যাতে পাঠক ও লেখক কেউ প্রতারিত না হন।
প্লাজিয়ারিজম আইন ও স্ক্রিনিং: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রকাশনা স্তরে লেখা চুরি ধরার আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা এবং কপিরাইট আইনকে আরও সহজ ও কার্যকর করা। প্রয়োজনে আলাদা আদালত গঠন করা যেতে পারে।
লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন: বাণিজ্যিক প্রকাশকদের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে সত্যিকারের লেখকদের নিজেদের উদ্যোগে, যৌথ অর্থায়নে স্বাধীন সাহিত্য পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন চর্চাকে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

১১. উপসংহার:
টাকার জোরে কেনা কাগজের মলাট সাময়িক চাকচিক্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা কখনো কালজয়ী সাহিত্যের মর্যাদা পায় না। যতক্ষণ না সাহিত্যের আঙিনাকে এই অর্থের সিন্ডিকেট, ছদ্ম-লেখক এবং ক্ষমতার দাপট থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ কবিতার বইয়ের এই আকাল ও পাঠক-খরা কাটবে না। কবিতার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার এই লড়াইয়ে সৎ লেখক, প্রকৃত পাঠক এবং বিবেকবান সমালোচকদের এখনই একজোট হয়ে সোচ্চার হতে হবে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা কে বাঁধবে

লেখক পরিচিতি:
কবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঝালকাঠি শহরে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এই লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস অতল জলে জলাঞ্জলি এবং কাব্যগ্রন্থ কথা-কাব্য, নীরব কথোপকথন ও আপন-ছায়া। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলা কসমিক উপন্যাস মস্তিষ্কে মহাকাশ, বাঁশফুল, ইংরেজি উপন্যাস Metacosm of Mind, ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Songs of Insane, গল্পগ্রন্থ মোমের শেষ শিখা, আরও আটটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর লিখা অটোফিকশন উপন্যাস \'শাওনাজ আইল্যান্ড\' বর্তমানে প্রকাশনার টেবিলে রয়েছে।

Labels: প্রবন্ধ


Source: অনলাইন সাহিত্য বিষয়ক ই-পত্রিকা

Post a Comment

© ‧ Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain