Posts

A K SARKER SHAON

লেখা, জীবন ও সত্যের সন্ধানে
কবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওনের সঙ্গে কথোপকথন
১. প্রথম দিকে কী কী বিষয় লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল, এবং সেই অনুপ্রেরণা কীভাবে আজও প্রভাবিত করে?
আমার লেখার প্রথম অনুপ্রেরণা কোনো বই নয়; জীবন। আমার শৈশব, গ্রাম, বাড়ি, গাছপালা, নদী, মাঠ, পরিচিত মানুষের মুখ, মায়ের ডাক, হারিয়ে যাওয়া সময়; এসবই আমাকে প্রথম লিখতে শিখিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে বুঝেছি, আমরা আসলে সামনে যতটা যাই, স্মৃতির ভেতরেও ততটাই ফিরে যাই।
আজও তাই আমার লেখায় শিকড় ফিরে আসে। পুরোনো বাড়ি, ফেলে আসা উঠোন কিংবা একটি গাছ আমার কাছে শুধু দৃশ্য নয়; এগুলো মানুষের অস্তিত্বের সাক্ষী। সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু চিহ্ন থেকে যায়। আমি সেই চিহ্নগুলোর ভাষা খুঁজে বেড়াই।

৫. সৃজনশীল লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভূমিকা কতটা?
অনেকখানি। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মানেই আত্মজীবনী নয়।
আমি যা দেখেছি, যাদের হারিয়েছি, যাদের ভালোবেসেছি, যে জায়গাগুলো ছেড়ে এসেছি, সেগুলো আমার ভেতরে এক ধরনের আবেগের ভাণ্ডার তৈরি করেছে। গল্পের ঘটনা কাল্পনিক হতে পারে, চরিত্র কাল্পনিক হতে পারে; কিন্তু তার কষ্ট বা আনন্দের অনুভূতিটা সত্য হওয়া প্রয়োজন।
আমার কাছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো বীজ। সাহিত্য সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছ।

৭. লেখার সময় কোন ধরনের পরিবেশ বা দৈনন্দিন অভ্যাস আপনাকে সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল করে তোলে?
নিরিবিলি পরিবেশ আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে ভোর, গভীর রাত কিংবা এমন কোনো সময়, যখন চারপাশের পৃথিবী একটু ধীর হয়ে আসে। আমার বাড়টা সেই রকম করেই গড়া।
তবে সম্পূর্ণ নীরবতাই সব নয়। বৃষ্টির শব্দ, দূরের মানুষের কথা, পাখির ডাক, জানালার বাইরে গাছের নড়াচড়া; এসবও আমাকে লিখতে সাহায্য করে।
আমার জন্য লেখার সবচেয়ে ভালো পরিবেশ আসলে সেই মুহূর্ত, যখন বাইরের কোলাহল থেকে নিজের ভেতরের কণ্ঠটা আলাদা করে শুনতে পারি।

১০. নতুন লেখকেরা নিজেদের স্বতন্ত্র কণ্ঠ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন; তাদের কী পরামর্শ দেবেন?
সুনির্মল বসুর কথা\'র সুরে বলছি \' আমি সবসময় শিক্ষানবিশ। তবুও বলার জন্য বলা।
নিজের কণ্ঠ খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই আলাদা হওয়ার চেষ্টা করবেন না। সত্য হওয়ার চেষ্টা করুন।
অনেক পড়ুন। অনেক দেখুন। মানুষের কথা শুনুন। তারপর লিখুন।
প্রথম দিকের লেখায় প্রিয় লেখকদের ছায়া থাকতেই পারে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। লিখতে লিখতেই একসময় এমন কিছু বাক্য আসবে, যেগুলো অন্য কারও মতো শোনাবে না। সেখানেই আপনার কণ্ঠের শুরু।
আর নিজের লেখা কাটতে শিখুন। লেখার প্রতি ভালোবাসা মানে প্রতিটি বাক্যের প্রতি মায়া নয়।

২০. গল্প কি মানুষের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে, নাকি শুধু আগে থেকেই থাকা বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে?
একটি সত্যিকারের ভালো গল্প দু\'টোই করতে পারে।
কখনো গল্প আমাদের নিজের বিশ্বাসকে আয়নায় দেখায়। আবার কখনো এমন একজন মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখায়, যার জীবন আমরা কখনো দেখিনি।
সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই; এটি আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য অন্য একজন মানুষ হতে দেয়।
একটি গল্প হয়তো পৃথিবী বদলায় না। কিন্তু একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সামান্য বদলে দিতে পারে। আর পৃথিবী তো শেষ পর্যন্ত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তৈরি।
২১. একটি ভালো লেখা কি নিঃসঙ্গময় জীবন অতিবাহিত করার ফসল?
শুধু নিঃসঙ্গতার ফসল বলব না; তবে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে সাহিত্যের একটি গভীর সম্পর্ক আছে।
একজন লেখক মানুষের ভিড়ের মধ্যেও অনেক সময় একা হয়ে যান। কারণ তিনি শুধু ঘটনাটি দেখেন না; ঘটনার পরে থেকে যাওয়া নীরবতাটিও দেখেন।
কিন্তু নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্ব এক নয়। আমার কাছে লেখকের নিঃসঙ্গতা অনেকটা একটি নির্জন ঘরের মতো, যেখানে তিনি জীবনের জমে থাকা শব্দগুলো শুনতে পান।
একজন লেখককে মানুষের মধ্যেও থাকতে হয়, আবার মাঝে মাঝে মানুষ থেকে একটু দূরেও দাঁড়াতে হয়। খুব কাছে থাকলে পুরো ছবিটি দেখা যায় না; খুব দূরে গেলে তার উষ্ণতা অনুভব করা যায় না।
তাই ভালো লেখা শুধু নিঃসঙ্গ জীবনের ফসল নয়। ভালো লেখা জন্ম নেয় জীবনকে গভীরভাবে যাপন করা এবং তারপর সেই জীবনকে কিছুটা দূর থেকে নীরবে দেখার ক্ষমতা থেকে।
আমি মানুষের সঙ্গে বাঁচি, স্মৃতির সঙ্গে হাঁটি, আর নিঃসঙ্গতায় বসে তাদের ভাষা খুঁজি।
সম্ভবত লেখক হিসেবে আমার কাজও এটুকুই যা চলে যাচ্ছে, তাকে আরেকটু সময় ধরে রাখা।

Labels: সাক্ষাৎকার


Source: অনলাইন সাহিত্য বিষয়ক ই-পত্রিকা

Post a Comment

© ‧ Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain