Posts

Subhash Sarbabiddya

কোটিপতির ইলিশ ও কেরানির পাবদা
==========================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
গেল শুক্রবার। অফিস ছুটির দিন। অলস সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই খবরের কাগজের ওপর চোখটা আটকে গেল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে নতুন করে ৫০৭৭ জন কোটিপতি যোগ হয়েছেন। চা গিলতে গিয়ে হালকা একটু ছ্যাঁকা লাগল গলায়। মনে মনে হিসাব করতে বসলাম, এই পাঁচ হাজার সাতশত সাত জনের তালিকায় কোনোভাবে ভুল করে আমার নামটা ঢুকে পড়েনি তো? পরক্ষণেই পকেটে হাত দিয়ে দেখি- চিরচেনা ছেঁড়া একটা দশ টাকার নোট আর মানিব্যাগের পাতলা অবয়ব জানান দিল, \"ওহে বাবু, তুমি এখনো সেই \'নুন আনতে পান্তা ফুরানো\' কেরানিই আছো।\"
ঠিক এই সময়ে রান্নাঘর থেকে গিন্নি এসে হাজির। বেশ কয়েকদিন ধরেই তার একটা দাবি বাতাসে ভাসছিল। আজ সেটা চূড়ান্ত রূপ নিল। গিন্নি চোখ ছোট ছোট করে বলল, \"হ্যাঁ গো, বহুদিন ধরে পদ্মার ইলিশ খাই না। গত বছরও আনব আনব করে আনোনি। বাজার থেকে আজকে একটা ভালো দেখে পদ্মার ইলিশ নিয়ে এসো তো। পত্রিকায় দেখলাম, বাজারে নাকি গুজরাটের ইলিশ এসেছে। ওই ইলিশ এনে কাজ নেই! পদ্মার ইলিশের যে গন্ধ, ওটাতেই অর্ধেক পেট ভরে যায়!\"
আমি মনে মনে ভাবলাম, গিন্নি আমার অর্ধেক পেট ভরানোর সস্তা উপায় খুঁজছে বটে, কিন্তু পদ্মার ইলিশের যে দাম, তাতে আমার পুরো পকেটটাই ফাঁকা হয়ে যাবে। বাজারে যাওয়ার পথে বারবার ওই ৫০৭৭ সংখ্যাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আচ্ছা, ওই নতুন কোটিপতিরা কি প্রতিদিন সকালে উঠে পদ্মার ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খায়?
বাজারে পা রাখতেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। রুপালি ইলিশগুলো বরফের ওপর এমনভাবে শুয়ে আছে, যেন একেকটা সোনার বার! বিক্রেতার কাছে গিয়ে বেশ ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, \"ভাই, ইলিশ কত করে?\" মাছ বিক্রেতা আমার মলিন শার্ট আর সস্তা জুতো জোড়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিল। তারপর এমন একটা দাম হাঁকাল, যা শুনে আমার মনে হলো- মাছ নয়, সে হয়তো আস্ত একটা পুকুরই বিক্রি করতে চাইছে! দামটা শোনার পর আমার কানের পাশ দিয়ে গরম হাওয়া বের হতে লাগল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই ৫০৭৭ জন কোটিপতির কেউ একজন পাশে থাকলে হয়তো বলত, \"ভাই, দুটা প্যাকেটে করে দাও।\" কিন্তু আমার মতো কেরানির পক্ষে ওই দামের ইলিশ কেনা মানে, মাসের বাকি বিশ দিন স্রেফ হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকা।
ইলিশের মায়া ত্যাগ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম পাশের গলিতে। সেখানে শান্ত-শিষ্ট হয়ে শুয়ে আছে পাবদা মাছ। সাইজে ছোট, দেখতে তো মন্দ না! ইলিশের মতো অত রাজকীয় না হলেও, এরও তো একটা নিজস্ব আভিজাত্য আছে। দামটাও নাগালের মধ্যে, অন্তত পকেট পুরোপুরি ডাকাতি হবে না। বিক্রেতাকে বলে চটপট এক কেজি পাবদা ওজনেই আনিয়ে নিলাম।
বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন গিন্নি ব্যাগ খুলে পাবদা মাছ দেখে চোখ কপালে তুলল, \"এ কী! আমি চাইলাম পদ্মার ইলিশ, আর তুমি নিয়ে এলে পাবদা?\"
আমি মুখে একটা দার্শনিক ও বিজ্ঞ হাসি ফুটিয়ে বললাম, \"আহা গিন্নি, তুমি বুঝছ না কেন! বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট দেখেছ? দেশে নতুন করে পাঁচ হাজার সাতাত্তর জন কোটিপতি বের হয়েছে। এখন বাজারে যত পদ্মার ইলিশ আছে, সব ওই কোটিপতিরা খাচ্ছে। ওসব মাছে এখন অহংকার আর ক্যাপিটালিস্টদের গন্ধ। আমরা হলাম খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। কেরানি মানুষ আমরা, আমাদের কি ওসব অহঙ্কারী মাছ খাওয়া সাজে? তার চেয়ে এই পাবদা মাছ দেখো- কেমন নরম, কাদা-মাটির মানুষের মতো সরল।\"
গিন্নি মুখটা একটু বাঁকা করল। আমি সুযোগ বুঝে আরও একটু তেল মেখে বললাম, \"তাছাড়া, পদ্মার ইলিশের চেয়ে সর্ষে-পাবদার স্বাদ কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। তুমি বরং এই পাবদাগুলো ভালো করে সর্ষে বেটে রাঁধো তো। কোটিপতিরা ইলিশ খেয়ে এসি রুমে বসে হজমের ওষুধ খাক, আর আমরা সর্ষে-পাবদা খেয়ে শান্তিতে ঘুমাই!\"
আমার এই অতি-লজিক্যাল এবং চরম আবেগীয় কথাগুলো শুনে গিন্নি আর কথা বাড়াল না। মাছের ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। আর আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কোটিপতির খাতায় নাম না উঠুক, পাবদা মাছের ঝোলে যে কেরানির শান্তি বজায় রইল, এটাই বা কম কিসের!
১৬ আগষ্ট ২০২৬ইং।

Labels: অণুগল্প


Source: অনলাইন সাহিত্য বিষয়ক ই-পত্রিকা

Post a Comment

© ‧ Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain